টুনি _ রত্না রায় চৌধুরী

0



টুনি

......... ……...

রত্না রায় চৌধুরী

চট্টগ্রাম জেলার রাঙ্গুনিয়া উপজেলাধীন সৈয়দ বাড়ি গ্রামে অবস্থিত একটি পরিবারের কথা বলছি। মৃণাল বাবু আর মমতা চৌধুরীর এক ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে সুখের সংসার। মৃণাল বাবু ব্যাংকে চাকরি করেন। মমতা গৃহিণী। ছেলে টুটুল পঞ্চম শ্রেণীতে আর মেয়ে টুনটুনি তৃতীয় শ্রেণীতে পড়ে। স্কুলটি তাদের বাড়ির পাশেই। মৃণাল বাবুর মেয়েটা দেখতে বেশ ছোটখাটো, চঞ্চল প্রকৃতির বলে সবাই নাম রেখেছিল টুনটুনি। এখন সবাই আদর করে টুনি বলে ডাকে। টুনি খুব চালাক এবং বুদ্ধিমতী। ভাই বোন দুজনেই খুব মেধাবী। মা-বাবা খুব যত্নের সাথেই সন্তান দুটোকে গড়ে তুলছেন। ওদের লেখাপড়া, আদব-কায়দা, খেলাধুলা এবং স্বাস্থ্যের ব্যাপারে উনারা খুবই সচেতন। সন্তানদের নিয়মিত বিদ্যালয় নিয়ে আসা, ওদের বাড়ির কাজ তদারকি করা, বিষয়ে শিক্ষকদের সাথে আলোচনা করে ছেলেমেয়েদের পাঠের অগ্রগতি জেনে নেওয়া উনাদের নিত্যদিনের কাজ। গত বছর অর্থাৎ ২০২০ সালে যখন চারিদিকে করোনা মহামারী ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় আতঙ্কিত পুরো বিশ্ব, আনন্দমুখর চঞ্চল প্রকৃতির যখন নীরব নিস্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল, থেমে গিয়েছিল মানুষের কোলাহল, সবাই গৃহবন্দি হয়ে পড়েছিল, তখন ছেলে মেয়েদের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করেই ১৭ ই মার্চ থেকে সমস্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। বিকল্প শিক্ষার কৌশল হিসেবে চালু করা হয়েছে শিক্ষকদের অনলাইন ক্লাস। বেতার ও সংসদ টিভিতে "ঘরে বসে শিখি" অনুষ্ঠানে শিক্ষকদের শ্রেণি অনুযায়ী নিয়মিত পাঠদান। এই দুর্যোগে মৃণাল বাবু একটু আতঙ্কিত হলেও পরক্ষণে উনার পরিবার যথেষ্ট সাহসের সাথে পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তিনি সাথে সাথে সবার জন্য মাস্ক, হ্যান্ড স্যানিটাইজার, স্প্রে ইত্যাদি নিয়ে আসলেন। ছেলেমেয়েদেরকে ঠিকমতো হাত ধোয়ার নিয়ম, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা, পুষ্টিকর খাবার খাওয়া, গরম পানির ভাপ নেওয়া, নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা, টিভিতে নিয়মিত স্বাস্থ্য বিষয়ক অনুষ্ঠান গুলো দেখা, বিকেল তিনটা থেকে চারটা রেডিওতে এবং চারটা থেকে পাঁচটা সংসদ টিভিতে শিক্ষকদের পাঠদান দেখা এইসব ব্যাপারে অভ্যস্ত করে তুললেন। মৃণাল বাবু পুকুরে মাছ চাষ করেন। উনার গরুর খামার, মুরগির খামার ও সবজি বাগান রয়েছে যেখান থেকে পরিবারের সুষম খাবারের প্রয়োজন মেটে। টুনি আর টুটুল পড়ালেখার পাশাপাশি মা-বাবাকে ঘরের কাজে সাহায্য করে। একদিন বিকেলে টুনি টুটুলের পাড়ার সহপাঠীরা এসেছে ওদেরকে খেলতে নিয়ে যাওয়ার জন্য কিন্তু টুনি ওদের সাথে খেলতে না গিয়ে বলেছে এখন খেলব না, চলো সবাই মিলে সংসদ টিভি দেখি। ওখানে অনেক লেখাপড়া শেখানো হয়। তখন সবাইকে স্প্রে করে, হ্যান্ড স্যানিটাইজার দিয়ে টুনি ঘরের ভেতর ঢুকলো এবং দূরত্ব বজায় রেখে বসালো। সবাই সংসদ টিভির পাঠদান দেখে খুব খুশি হলো। অনেকের ঘরে টিভি না থাকাতে অনুষ্ঠান দেখা হয় না। তারপর সবাই গেল পাশের মাঠে খেলতে। সহপাঠীরা এর কাছে জানতে চাইল কি খেলবে? টুনি বলল আজ আমরা টিচার টিচার খেলবো। সবাই রাজি। টুনি সবাইকে দূরত্ব বজায় রেখে মাঠে গোল করে বসলো। তারপর হাত ধোয়ার নিয়ম, মাস্ক পরার নিয়ম, করোনাকালীন কিভাবে নিরাপদ থাকা যায় একে একে সব কিছু শেখালো। ভাগ্যক্রমে আমি ওদের শিক্ষক। সেদিন গিয়েছিলাম টুনি আর টুটুলদের বাড়িতে ওদের লেখাপড়ার ব্যাপারে জানতে। আমি ওদের আচরণ দেখে আর অভিভাবকদের সাথে কথা বলে সত্যিই মুগ্ধ। মৃণাল বাবু এবং মমতা দেবী বললেন, ম্যাডাম আপনাদের কথা অনুযায়ী আমরা সন্তানদের খুব যত্ন নিচ্ছি। বাসায় শিক্ষক রেখে পড়াচ্ছি যাতে পরবর্তী ক্লাসে কোন সমস্যা না হয়। সত্যিই উনাদের পরিবার একটা আদর্শ পরিবার। আমাদের দেশের সব পরিবার যদি মৃণাল বাবুর পরিবারের মত হয় এবং সন্তানরা টুনি আর টুটুলের মতো বিনয়ী হয় তবে আমরা খুব তাড়াতাড়ি একটা করোনামুক্ত সুন্দর পৃথিবী ফিরে পাবো। ছোট্ট সোনামণি বন্ধুরা তোমরা সবাই টুনি আর টুটুলের মতো মা বাবার কথা মেনে চলবে। তাহলে আমরা একটি সুস্থ পরিবেশে আবার আমাদের কর্মমুখর আনন্দঘন স্কুলে লেখাপড়া করতে পারব।

Post a Comment

0Comments
Post a Comment (0)