টিটিয়ান
......... ……...
ফরিদা ইয়াসমীন নার্গিস
❑
একা ঘরে পিয়াসের একদমই ভাল
লাগে না। মা কে অনেকবার বলেছে চাকরি না করতে। সেই সকাল বেলা মা-বাবা দুজন বেরিয়ে যায়।
সকালে ঘুম থেকে তড়িঘড়ি করে উঠে মায়ের সাথে স্কুলে যেতে হয় ঠিকই কিন্তু ঐটুকু সময়ই তার
মনটা খুব ভাল থাকে।
ক্লাসের বন্ধুদের মায়েরা
কি সুন্দর স্কুল ছুটির সময় বাইরে অপেক্ষা করে। ওরা ছুট্টে গিয়ে মা কে জড়িয়ে ধরে। পিয়াস
তাকিয়ে থাকে তৃষ্ণার্তের মতো। ভাবে মা টা যে কেন ওদের মায়ের মতো নয়! মাঝে মাঝে খুব
অভিমানও হয় ওর। ভাবে, আজ মা এলে কথাই বলবে না। কিন্তু মা যখন ফিরে এসে সোনা বাবা বলে
ডাকে তখন আর কিছু মনে থাকে না।
বাসায় ওর দেখাশোনার জন্য
গ্রাম থেকে একজন লোক আনা হয়েছে। তাকে পিয়াস ডাকে মোবারক ভাই বলে। সে ওকে প্রতিদিন স্কুলে
আনতে যায়। মোবারক ভাই সহজে কথা বলে না। প্রথম প্রথম পিয়াস অনেক প্রশ্ন করতো তার কাছে
কিন্ত উত্তর না পেতে পেতে এখন উৎসাহ হারিয়ে গেছে একেবারে। সারাদিন বসে বসে টিভিতে কার্টুন
আর এ্যাডভেঞ্চার কাহিনী দেখে সে। আর মাঝে মাঝেই মায়ের জন্য মন কেমন করে, ভাবে মা বাবা
পাশে থাকলে কি ভালটাই না হতো!
রাতে মায়ের পাশে শুয়ে বলে,
মা আমার আর একা একা থাকতে ভাল লাগে না। আমার বন্ধুদের মায়েরা তো ঘরেই থাকে, তুমি কেন
থাকো না?
মা ওর মাথায় হাত বুলিয়ে
দিতে দিতে বললেন, সবাই তো চাকরি করে না, বাবা। এত মন খারাপ করতে হয় না। তুমি না বড়
হয়েছ? এখন তো আমার সোনাবাবাটা টু'তে পড়ে। আস্তে আস্তে কত্তো বড় হয়ে যাচ্ছে। পিয়াসের
মুখটা তখনও ভার দেখে মা বললেন, এ সপ্তাহে ছুটির দিনে নদীর ধারে ঘুরতে গেলে কেমন হয়?
অমনি ছেলের মুখটা ঝলমল করে ওঠে।
নিয়ে যাবে মা! সারাবিকেল
ঘুরবো কিন্তু, ছেলের আবদার। আইসক্রিম খাওয়াতে হবে, মনে থাকবে তো?
মা বললেন, খুব থাকবে বাবা।
ছুটির বিকেলে পিয়াস বাবা
মায়ের সাথে বেড়াতে বের হল। পথে আইসক্রীম খেয়ে, বেলুন কিনে ওড়াতে ওড়াতে চলে গেল নদীর
কাছে। শান্ত সুন্দর এই নদীটি পিয়াসের বড় ভাল লাগে। নদীর তীরে বেশে খানিকটা ঘাসে ভরা
জায়গা। বেশ ছোটাছুটি করা যায়। কিছুক্ষণ পরে প্রান্ত এলো তার মামার সাথে। প্রান্ত পিয়াসের
খুব ভাল বন্ধু। দুজন মিলে বেশ আনন্দ হচ্ছে। বাবা মা নদীর ধারে বসে কথা বলছেন। দুবন্ধু
হঠাৎ লক্ষ্য করল একটু দূরে একটা গর্তের মতো কিছু। কাছে ছুটে গেল দেখার জন্য। হঠাৎ পিয়াস
পড়ে গেল গর্তের মধ্যে। নিচের দিকে বেশ খানিকটা গিয়ে একটা ছোট পথ দেখতে পেল পিয়াস। পথটি
বেশ
আলোকিত। একটু সামনে এগুতেই
একটা অদ্ভুত জায়গা। সেখানে ছোট ছোট অনেক মানুষ। চার পাঁচজন মিলে ওর ক্রিকেট ব্যাটের
সমান হতে পারে। ভারী অদ্ভুত তো! পিয়াস অবাক হয়ে দেখছিল। ওদের ঘরগুলো ও বেশ ছোট ছোট,
কবুতরের ঘরের মতো। লোকগুলো প্রথমে ওকে দেখে দৌড়ে পালাতে লাগল। কিছুক্ষণ পরে একজন লোক
এলো, মনে হল সে ওদের মধ্যে গণ্যমান্য কেউ, সাহসীও বটে। অদ্ভুত ভাষায় তারা নিজেদের মধ্যে
কথা বলছিল। অনেকটা পাখিদের কিচিরমিচির এর মতো। পিয়াসের সবকিছু বেশ ভাল লাগছিল। এমন
পরিবেশ আগে কখনও দেখেনি তো। মাতবর টাইপের লোকটা পিয়াসের দিকে এগিয়ে এলো। বেশ সমঝদার
ভাবসাব তার। কিছু একটা বোঝাতে চাইলো ওকে। মনে হল, ওকে পেয়ে তারা খুশি এমনটাই বলেছে।
মাতবরের কথামতো ৫/৬ জন লোক মিলে একটা মাদুর ধরনের জিনিস নিয়ে এলো। বুঝল যে ওকে বসতে
বলছে। পিয়াস বসল, কিছুক্ষণ পরে তারা ৩/৪ জন মিলে কয়েকটা পাত্র নিয়ে এলো। তার মধ্যে
ছোট ছোট মাংশের টুকরা, কোনটাতে খুব ছোট ছোট রুটি, কোনটাতে ছোট ছোট ফল। পিয়াস বুঝলো
মাতবর ওকে খেতে বলছে। ও খাবারগুলো বেশ মজা করে খেয়ে নিল। অথচ বাড়িতে বসে খাবার খেতে
তার ভালই লাগে না। খাওয়া শেষে তারা ওকে নিয়ে ঘুরতে বের হলো। ভারি অদ্ভুত দেশ একটা।
সবকিছুই মানুষের দেশের মতো কিন্তু সবই ছোট ছোট। দেশটার নামটাও বেশ চমৎকার, টিটিয়ান।
হঠাৎ একটা বাতাস এলো একটু
জোরে লোকগুলো ছুটে ছুটে পিয়াসের কাছে আসতে লাগল। ও সবাইকে আড়াল করে রাখল। অনেকের ঘর
পিয়াস বাঁচিয়ে দিল ঝড়ের কবল থেকে। এরপর লোকগুলো পিয়াসকে আরও বেশি শ্রদ্ধা ভক্তি দেখাতে
লাগল। পিয়াস বোঝাল যে তার ঘুম পাচ্ছে। কয়েকজন লোক মিলে আরও ২/৩টা মাদুর এনে তাকে শোয়ার
ব্যবস্থা করে দিল। শুয়েই ঘুমিয়ে পড়লো সে। কতক্ষণ ঘুমিয়েছে কে জানে? মনে হল লোকগুলো
ওর হাত ধরে ঝাঁকাচ্ছে।
চোখ খুলে তাকিয়ে পিয়াসের
বিস্ময়ের আর সীমা রইল না। দেখল মা চোখ মুছছেন। মায়ের হাতটা ওর হাতের ওপরে।
বলল, কি হয়েছে মা? আমি এখানে
এলাম কি করে?
কি বলছ, সোনা বাবা? এটা
তো আমাদের বাসা?
কিন্তু কিন্তু....
কিন্তু কি বাবা?
আমি তো এখানে ছিলাম না।
আর ঐ ছোট ছোট লোকগুলোই বা কোথায় গেলো?
অামি তো ওদের দেশেই ছিলাম।
তুমি হয়তো স্বপ্ন দেখছিলে।
তুমি একটা ছোট গর্তে পড়ে গিয়েছিলে। সেখান থেকে তুলে মনে হল তোমার শরীর ঠিক নেই তাই
ডাক্তার ডেকেছিলাম। ডাক্তার তোমাকে দেখে বলেছিল, "আপনার ছেলের কোন সমস্যা হয়নি,
সে ঘুমাচ্ছে। "
পিয়াস ভাবতে লাগল টিটিয়ানবাসীদের
কথা।
** ** **

